১০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে : জাতিসংঘ

১০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে  জাতিসংঘ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : জাতিসংঘ বলেছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক সহিংস অভিযানের ফলে কমপক্ষে ১০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। কিন্তু এর প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে মনে করছে জাতিসংঘ।

বুধবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র ভিভিয়ান তান এই তথ্য জানিয়েছেন। অপরদিকে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর নির্যাতনের ঘটনায় সমালোচনার প্রেক্ষাপটে দেশটির সরকারের উপদেষ্টা এবং কার্যত প্রধান, শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সু চি গতকাল জাতীয় ঐক্য নিয়ে মুখ খুলেছেন।

কিন্তু তিনি ‘রোহিঙ্গা’শব্দটি উচ্চারণ করেননি। অপরদিকে রোহিঙ্গা নির্যাতনের ফলে  আসিয়ানে মিয়ানমারের সদস্যপদ রাখার প্রসঙ্গে পুনর্বিবেচনা করা উচিত বলে মন্তব্য করেছে ১০ জাতির সংস্থাটির প্রভাবশালী সদস্য মালয়েশিয়া। ব্যাংককে গতকাল ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র সাংবাদিকদের জানান, ‘বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তি করে আমরা হিসাব করে দেখেছি গত কয়েক সপ্তাহে অন্তত ১০ হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে এসেছে।’ তিনি জানান, ‘সেখানে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টাচ্ছে ও সম্প্রতি বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।’

একই সাথে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ আশ্রয়ের অনুমতি দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর। মুখপাত্র তান জানান, ‘আন্তর্জাতিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে রোহিঙ্গাদের প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা দেওয়ার প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সরকারকে সমর্থন দিতে প্রস্তুত রয়েছি।’

‘রোহিঙ্গা’ না বলে জাতীয় ঐক্য পুনরুদ্ধার চান সু চি! : সিঙ্গাপুরে একটি বাণিজ্য সম্মেলনে সু চি জানান, মিয়ানমার একটি বহু জাতির দেশ এবং এর জাতীয় ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তাঁর সরকার কাজ করবে। রোহিঙ্গা নির্যাতনের প্রসঙ্গে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে তিনি এই বক্তব্য দিলেও রোহিঙ্গাদের কথা উল্লেখ করেননি।

স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি দেশটিতে শান্তি ও জাতীয় ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘আপনারা জানেন, আমাদের অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমাদের দেশ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি দেশ। আমাদের স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করতে হবে, সিঙ্গাপুরে যেটা নিয়ে আপনারা গর্ব করেন।’

সু চি বলেন, ‘যে দেশ স্থিতিশীল নয়, সে দেশে ব্যবসায় বিনিয়োগ আশা করা যায় না। আমরা অস্থিতিশীল হতে চাই না। কিন্তু আমাদের দেশে অনৈক্যের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সুতরাং জাতীয় ঐক্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা আমাদের জন্য অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ।’

ধনী রাষ্ট্র সিঙ্গাপুরে তিন দিনের সফরে রয়েছেন সু চি। সিঙ্গাপুর হচ্ছে চীনের পরই মিয়ানমারের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী দেশ। আসিয়ানের পদক্ষেপ চায় মালয়েশিয়া : গতকাল রাজধানী কুয়ালালামপুরে এক অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী খায়েরি জামালুদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূল অভিযানের কারণে ‘মিয়ানমারের আসিয়ান সদস্য পদ বহাল থাকবে কি না সেটা অবশ্যই পুনর্বিবেচনা করা উচিত।’

মালয়েশিয়ায় ক্ষমতাসীন দল ইউনাইটেড মালয়েশিয়া ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন বার্ষিক সমাবেশে গতকাল বক্তব্য দেন ক্রীড়ামন্ত্রী খায়েরি জামালুদ্দিন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমরা আসিয়ানের কাছে দাবি জানাচ্ছি যে মিয়ানমারের সদস্য পদ পর্যালোচনা করা হোক। একটি আসিয়ান সদস্য রাষ্ট্রে যখন ব্যাপক আকারে জাতিগত নির্মূল অভিযান চলে, তখন আসিয়ান সদস্য রাষ্ট্রটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করায় মূল মূলনীতি অকার্যকর হয়ে পড়ে।’

এ সময় রোহিঙ্গাদের দুরবস্থা তুলে ধরে একটি ভিডিও দেখানো হয়। রোহিঙ্গা নির্যাতন ভয়াবহ আকার ধারণ করায় সম্প্রতি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ মালয়েশিয়া তীব্র সমালোচনা করেছে মিয়ানমারের। গত শুক্রবার মালয়েশিয়া সরকার মিয়ানমারের দূতকে তলব করে। মিয়ানমারে গত ৯ অক্টোবর পুলিশের চৌকিতে হামলার পর সেনাবাহিনী দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য রাখাইনে নিষ্ঠুর দমন অভিযান শুরু করে। অভিযানে সেনাবাহিনী ৩০ হাজারের মতো রোহিঙ্গাকে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের প্রবেশ বন্ধ করতে বাংলাদেশ সীমান্ত নজরদারি বাড়িয়েছে।

কিন্তু এর পরও গত সপ্তাহে বাংলাদেশে কয়েক হাজার মানুষের ঢল নামে। বাংলাদেশে আসার পর রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক গণধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার মতো ভয়াবহ নিপীড়নের কথা তুলে ধরেছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ) স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে জানায়, রোহিঙ্গা গ্রামগুলোয় হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থা গত মঙ্গলবার জানিয়েছে, রাখাইনে রোহিঙ্গারা মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার হচ্ছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে, যদিও সরকার রোহিঙ্গাপল্লীতে বিদেশি সাংবাদিক ও নিরপেক্ষ তদন্তকারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে রেখেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *