পশ্চিম পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহায়তার সিদ্ধান্ত ছিল চাকমা ও মারমাদের-১

ত্রিদীপ রায়পার্বত্য চট্টগ্রামে নৃতাত্বিকভাবে বাঙালী নয় কিন্তু নাগরিকত্বে বাংলাদেশি এমন আলোকিত মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয় বাংলাদেশে। উপজাতি কিংবা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বলে পরিচিত এদের অনেকেই শিক্ষায় এবং কর্মে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন এবং করে যাচ্ছেন। উদাহরণ হিসেবে চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়ের কথাই ধরা যেতে পারে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে প্রেক্ষাপট ধরলে নিঃসন্দেহে তাকে এবং অনেককেই বহুগুণে ছাড়িয়ে যাবেন তার বাবা। রাজা ত্রিদিব রায়। কিন্তু তার সেই আলোকিত রূপ বাংলাদেশের কোনো উপকারে আসেনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিই আনুগত্য বজায় রেখেছেন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত সে দেশের মন্ত্রীর মর্যাদায় অধিভুক্ত ছিলেন তিনি এবং রাজা ত্রিদিব রায় একজন যুদ্ধাপরাধী। আমাদের স্বাধীনতার বিরোধীতায় এবং স্বাধীনের পরও স্বীকৃতির বিরুদ্ধে তৎপরতা চালিয়েছেন। শোনা যাচ্ছে তার মরদেহ পার্বত্য চট্টগ্রামে সমাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং বাংলাদেশ সরকারের আপত্তি কারণে তার মরদেহ আনা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের একজন নাগরিক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিতদের একজন হিসেবে আমরাও সেই আপত্তি এবং আপত্তির কারণ তুলে ধরছি।
আর সেই নির্মম অত্যাচারের ধরণ সম্পর্কে জানা গেছে শরদিন্দু শেখর চাকমার লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রাম’ (অঙ্কুর প্রকাশনী, ২০০৬) বইয়ে, ‘রাঙ্গামাটি মহকুমা সদরের এসডিও আবদুল আলী কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে দুটি স্পিডবোটে করে মহালছড়ি থেকে রাঙ্গামাটি আসেন। স্পিডবোটে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা এস এম কালাম, আবদুল শুক্কুর, শফিকুল ইসলাম, মামুন, সামসুল হক মাস্টার এবং রাঙ্গামাটি হাই স্কুলের তদানীস্তন হেডমাস্টার রহমান আলীর ছেলে ইফতেখার। এর মধ্যে স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করার জন্য আবদুল আলীকে রাঙ্গামাটিতে পুলিশ লাইনের এক ব্যারাকে আটক করে রেখে তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্লেড দিয়ে আঁচড়ে দেয়া হয়েছিল। এরপর সেসব জায়গায় লবণ দেয়া হয়েছিল। তাছাড়া তাকে একটি জিপের পেছনে বেঁধে টেনে রাঙ্গামাটির বিভিন্ন জায়গায় ঘোরানো হয়েছিল’ (পৃ: ২৬-২৭)।
একই বইয়ের ৩০-৩১ পৃষ্ঠায় শরদিন্দু লিখেছেন, ‘ৃআমি তাকে (রাজা ত্রিদিব রায়) বলি, আমার তো মনে হয় পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে যাবে এবং তার পক্ষে স্রোতের বিপরীতে যাওয়া ঠিক হয়নি। রাজা ত্রিদিব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর বলেন, পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হবে না, যদি ভারত পাকিস্তানকে যুদ্ধে পরাস্থ করতে না পারে। আর ভারত পাকিস্তানকে পরাস্ত করতে পারবে না, কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে চীন এবং আমেরিকা রয়েছে। তারা কোনদিন পাকিস্তানকে ভারতের নিকট পরাজিত হতে দেবে না। রাজা ত্রিদিব রায়ের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি তিনি তখন পাকিস্তানিদের চেয়ে বেশি পাকিস্তানি হয়েছেন।’
ত্রিদিপ রায়প্রথমেই আসি মুক্তিযুদ্ধে উপজাতি কিংবা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ভূমিকা নিয়ে। উপজাতি কিংবা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে বিরোধীতা করেছিলো। এখানে লক্ষণীয় তাদের বসবাসের জায়গাটা সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় সেখানে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং মুক্তিবাহিনী- দুইপক্ষই ছিলো ভীষণভাবে তৎপর। এই পর্যায়ে এসে উপজাতি কিংবা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা গোষ্ঠীগতভাবে সিদ্ধান্ত নেয় তারা কোন পক্ষে যাবে। ত্রিপুরা, সাঁওতাল এবং গারোরা সরাসরি পাকিস্তানের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। চাকমা, মারমারা পাকিস্তানের পক্ষে। রাজা মংপ্রু সেনের নেতৃত্বে ত্রিপুরারা মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বোতভাবে সহায়তা করেছে। এই যে সহায়তা কিংবা বিরোধিতা- এটা গোষ্ঠীগত সিদ্ধান্ত, গোষ্ঠী প্রধানের নির্দেশ। এখানে সমর্থন অর্থে বলা হয়েছে। এই সমর্থনের অর্থ ইনটেলিজেন্স, আশ্রয় এবং লোকবল দিয়ে সহায়তা। প্রত্যক্ষ লড়াইয়ে মুক্তিবাহিনীর হয়ে ত্রিপুরাই শুধু নয়, গারোরা লড়েছেন, সাওতালরা লড়েছেন।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহায়তার সিদ্ধান্ত ছিল চাকমা ও মারমাদের। তাদের এই সিদ্ধান্তটা এসেছে রাজা ত্রিদিব রায়ের তরফে। তিনি গোষ্ঠীপ্রধান। এপ্রিলের মাঝামাঝি, নির্দিষ্ট করে বললে ১৬ তারিখ রাঙ্গামাটিতে পাকিস্তান থার্ড কমান্ডো ব্যাটেলিয়ান অবস্থান নেয়। স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপের এলিট কমান্ডোদের প্রধান মেজর জহির আলম খান (২৬ মার্চ রাতে যিনি শেখ মুজিবকে গ্রেফতারে নেতৃত্ব দেন) ত্রিদিব রায়ের সঙ্গে দেখা করে সবধরণের সহায়তার প্রতিশ্রুতি পান। সঙ্গে যোগ দেয় লালডেঙ্গার নেতৃত্বাধীন মিজোদের একটি ব্রিগেড। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে মুক্তিবাহিনী এবং বিএসএফের সম্ভাব্য তৎপরতা এবং তা ঠেকানোর জন্য সহায়তার কথা ছিলো সে প্রতিশ্রুতিতে। শুধু ত্রিদিব রায়ের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী দলই নয়, রাঙামাটিতে ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সেস (ইপিসিএএফ) প্রাথমিকভাবে যোগ দেয় প্রায় ৩ শতাধীক চাকমা। যুদ্ধশেষে গোটা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় বাহিনীর হাতে গ্রেফতারের সংখ্যাটা এক মাসে ছিলো দেড় হাজারের ওপর। যদিও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আওতায় তাদের সবাইকেই পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ব্রিগেডিয়ার হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়া জহির আলম খান তার আত্মজীবনী ‘দ্য ওয়ে ইট ওয়াজ’ বইয়ে চাকমা এবং মিজোদের সহায়তায় পার্বত্য অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে নানা তৎপরতার বিস্তারিত লিখেছেন।
[ ভাবানুবাদ: ভোররাতের দিকে আমরা রাঙ্গামাটিতে পা রাখি, পরদিন চাকমাদের গোষ্ঠীপ্রধান রাজা ত্রিদিব রায়ের সঙ্গে দেখা করে, পঞ্চাশ গজ চওড়া একটা খালের ওপারে পুরানো এক বাংলোয় তিনি থাকতেন। সে রাজাকে বুঝিয়ে বলি যে পার্বত্য অঞ্চলে পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সেনাবাহিনী এসেছে। এবং শান্তি বজায় রাখতে ও বিদ্রোহীদের (মুক্তিবাহিনীর) চলাচল, জমায়েত আর যে কোনোধরণের তৎপরতার খবর পেতে তার সহায়তা চাইলেন। রাজা রাজী হলেন এবং পাক বাহিনীর আত্মসমর্পনের আগ পর্যন্ত তার সহযোগিতা পেয়েছে তারা। পূর্ব পাকিস্তানে আত্মসমর্পনের আগেই অবশ্য সরকারের অনুরোধে পশ্চিম পাকিস্তানে আসেন রাজা ত্রিদিব রায়। অনেকগুলো দেশে তিনি পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ইসলামাবাদে মৃত্যু বরণ করেন।]
রাঙ্গামাটিতে দলবলসহ জহিরের এই আগমন কিন্তু নেহাতই সামরিক আদেশ ছিলো না। আর তার প্রমাণ মিলেছে খোদ ত্রিদিব রায়ের জবানিতে। আত্মজীবনী তে জানিয়েছেন, ১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল সকালে তিনি (রাজা ত্রিদিব রায়) তার ভগ্নিপতি কর্নেল হিউম, ম্যাজিট্রেট মোনায়েম চৌধুরী, মোঃ হজরত আলী এবং আরো কয়েকজন বাঙালি মুসলিম লীগ নেতাসহ চট্টগ্রামের নতুন পাড়ায় অবস্থিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেন্টার-এর পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেন। পাকিস্তানিদের সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয় যে ম্যাজিস্ট্রেট মোনায়েম চৌধুরী এবং রাজা ত্রিদিব রায়ের সঙ্গে আসা আরো কয়েকজন বাঙালি ঢাকা থেকে আসা জুনিয়র অফিসারকে সঙ্গে করে কাপ্তাইয়ে যাবেন। ঠিক সেদিনই বিকেলে কাপ্তাই থেকে সেনাবাহিনীর একটি দল কয়েকটি লঞ্চ এবং স্পিডবোট নিয়ে রাঙামাটি আসে এবং বিনা প্রতিরোধে দখল করে নেয়। [highlight]সম্পাদক ও প্রকাশক: নুরুল আলম[/highlight]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *