পশ্চিম পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহায়তার সিদ্ধান্ত ছিল চাকমাদের-২

পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজা ত্রিদীব রায়ের তার মরদেহ পার্বত্য চট্টগ্রামে সমাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং বাংলাদেশ সরকারের আপত্তি কারণে তার মরদেহ আনা সম্ভব হয়নি। জিয়াউর রহমানবাংলাদেশের একজন নাগরিক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিতদের একজন হিসেবে আমরাও সেই আপত্তি এবং আপত্তির কারণ তুলে ধরছি।
প্রথম পর্বের পর: এই দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসার পক্ষে সাফাই হিসেবে লিখেছেন: যাদের বিরুদ্ধে তার এই অভিযোগ সেই মুক্তিবাহিনীর মূল নেতৃত্বে ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। তার অন্যতম সঙ্গী ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামানের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী ১১ এপ্রিল পাকিস্তানীদের সাড়াশি আক্রমণের মুখে কালুরঘাট ব্রিজের নিয়ন্ত্রণ হারায় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যদের নিয়ে গড়া মুক্তিবাহিনী।

দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন অলি আহমেদ (৩০ মার্চ জিয়া তাকে কালুরঘাট প্রতিরক্ষার দায়িত্ব দিয়ে রামগড় মহাকুমায়ক্যাপ্টেন অলি আহমেদ চলে যান ও মানিকছড়ি মাটিরাঙ্গা, গুইমারার “বর্তমান সেনা ক্যাম্প” ডাকবাংলায় মাঝে মাঝে আবস্থান করতেন)। ১২ এপ্রিল তারা পশ্চাদপসরন করে রাঙামাটি এসে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলেন।আর মীর শওকত আলীর নেতৃত্বে মহালছড়িতে ব্যাটেলিয়ান হেডকোয়ার্টার, সেখান থেকে একেকজন সামরিক অফিসারের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলোতে অবস্থান নেন মুক্তিযোদ্ধারা।এক কোম্পানি যোদ্ধা নিয়ে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির দায়িত্ব নেন ক্যাপ্টেন আফতাব কাদের। বুড়িঘাট ও রাঙামাটির মাঝামাঝি অবস্থান নেন খালেকুজ্জামান। লে. মাহফুজ তার ডিফেন্স গড়ে তোলেন বড়কল ও রাঙামাটির মাঝে। সুবেদার মোতালেব দায়িত্ব নেন কুতুবছড়ির। [তথ্যসূত্র: একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ : প্রতিরোধের প্রথম প্রহর/ মেজর রফিকুল ইসলাম (পিএসসি)/পৃ: ৪২-৪৭]

এদের ঠেকাতেই ত্রিদিব রায়ের চট্টগ্রাম যাওয়া এবং পাকিস্তানীদের নিয়ে আসা। এই আগমন তার কাছে কিরকম প্রত্যাশিত এবং এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি কতখানি আনন্দিত স্মৃতিকথায় তার বর্ণনাও দিয়েছেন: রাজা তার প্রতিশ্রুতি পালন করেছেন একদম শুরু থেকেই। জহির আলম যে সহযোগিতার কথা লিখেছেন তার মধ্যে রয়েছে একদল মুক্তিযোদ্ধার কথাও, ত্রিদিব রায়ের দেওয়া গোপন খবরে যারা অসহায়ের মতো ধরা পড়েছিলো সেদিনই রাঙামাটিতে পা রাখা পাকিস্তানীদের হাতে। সদ্য ট্রেনিং পাওয়া এই দলটি এসেছিলো মূলত মহালছড়ি ডিফেন্সে সহায়তা করতে। এদের অন্যতম ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশিওলজির ছাত্র এবং এফ রহমান হলের আবাসিক ছাত্র ইফতিখার (কিছু বইয়ে তার নাম ইফতেখার হিসেবে উল্লেখিত) ।

মুক্তিযোদ্ধাদের একদম প্রথম ব্যাচে ট্রেনিং নিয়েছিলেন তিনি। বাংলার অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামান সেসময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন, এফ রহমান হলের প্রভোস্ট ছিলেন তিনি। স্মৃতিকথা ‘আমার একাত্তর’ (সাহিত্য প্রকাশ, ১৯৯৭) বইয়ের ষষ্ঠ অধ্যায়ের ৪৮ এবং ৪৯ পৃষ্টায় ছিলো ইফতিখারের কথা। আনিসুজ্জামানের ভাষায়, ‘রামগড়ে পৌছাবার পরপরই দেখা হয়েছিল আমার হলের আবাসিক ছাত্র ইফতিখারের সঙ্গে। যতদূর মনে পড়ে, সমাজতত্বের ছাত্র ছিল। ওকে মনে রাখার একটা বিশেষ কারণ ঘটেছিল, সেটা আগে বলে নিই। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ড্রাইভারের সঙ্গে কয়েকজন ছাত্র দূর্ব্যবহার করেছিল। অভিযুক্তদের মধ্যে ইফতিখারও ছিল, সে অবশ্য নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছিল। তাকে ভালো করে জেরা করার পর আমি নিঃসংশয় হয়েছিলাম যে ঘটনার সঙ্গে সে জড়িত ছিল না। সেই ইফতিখারকে দেখলাম সাবরুমের দিক থেকে রামগড়ে এসে নামলো নৌকা থেকে। আমাকে দেখে সে অভিভূত। বললো, যুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে ফিরছে, তারাই প্রথম ব্যাচের। তারপর সে আমার পিছনে লেগে রইলো, সে রাঙামাটিতে গিয়ে যুদ্ধ করতে চায়। তার বাবা সেখানে স্কুলের হেডমাস্টার। রাঙামাটি গিয়ে বাড়ির সকলকে দেখবে এবং যুদ্ধ করে তাদের মুক্ত করে আনবে- এমন ইচ্ছেয় সে টগবগ করছে।তার ধারণা সামরিক কর্তৃপক্ষকে আমি বললেই তার রাঙামাটি যাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তাকে যতোই বোঝাতে চাই যে এসব রণকৌশল সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলতে যাওয়া আমার পক্ষে অসঙ্গত, সে ততোই মিনতি করতে থাকে। তারপর একদিন হঠাৎ আর খোঁজ নেই তার। পরে জানতে পারি সবার নিষেধ অগ্রাহ্য করে সে শত্রুকবলিত রাঙামাটির দিকেই চলে যায় এবং পাকিস্তানী সেনাদের অ্যামবুশে শহীদ হয়।’

শেষ তথ্যটুকু ভুল। ইফতিখার অ্যামবুশে পড়েছিলেন, কিন্তু সেখানেই শহীদ হননি। তাকে অসম্ভব যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করা হয়েছিলো। মুক্তিযুদ্ধ গবেষক জামাল উদ্দিন ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস’ (বলাকা প্রকাশনী, ২০১১) বইয়ের ৩৭৯-৩৮০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন সেই অ্যামবুশের, ‘অত্যান্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পাক দালাল খ্যাত চিহ্নিত এক উপজাতীয় নেতার (রাজা ত্রিদিব রায়) বিশ্বাসঘাতকতায় ওই দিনই পাকিস্তানি বাহিনী রাঙ্গামাটিতে এসে চুপিসারে অবস্থান নেয়, যা মুক্তিযোদ্ধাদের জানা ছিল না। ভারত প্রত্যাগত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসকের বাংলোর কাছাকাছি পৌঁছার সাথে সাথে সেখানে ওঁৎ পেতে থাকা পাকিস্তানি সৈনিকেরা মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে ফেলে। এ দলে ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা রাঙ্গামাটির আবদুল শুক্কুর, এসএম কামাল, শফিকুর রহমান, ইফতেখার, ইলিয়াস, আবদুল বারী, মো. মামুন ও আবুল কালাম আজাদ। ধৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে একমাত্র আবুল কালাম আজাদ ও ফুড ইন্সপেক্টর আবদুল বারী ছাড়া অন্যদের পাকবাহিনী নির্মমভাবে অত্যাচার চালিয়ে মানিকছড়িতে নিয়ে হত্যা করে।’ [highlight]সম্পাদক ও প্রকাশক: নুরুল আলম[/highlight]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *