পশ্চিম পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহায়তার সিদ্ধান্ত ছিল চাকমাদের-৩

[highlight]মুক্তিযুদ্ধে মগরাজা মংপ্রু সেনের সহায়তা[/highlight]

পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজা ত্রিদীব রায়ের তার মরদেহ পার্বত্য চট্টগ্রামে সমাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং বাংলাদেশ সরকারের আপত্তি কারণে তার মরদেহ আনা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের একজন নাগরিক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিতদের একজন হিসেবে আমরাও সেই আপত্তি এবং আপত্তির কারণ তুলে ধরছি।

কথাটা ভুল নয়। নিজেকে সাচ্চা পাকিস্তানি হিসেবে প্রমাণের কোনো উপায় বাদ রাখেননি ত্রিদিব রায়। তার নির্দেশ মেনে অনুগত চাকমা ও মিজোদের নিয়ে গড়া ব্রিগেড সরাসরি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হয়ে লড়তে থাকে। মহালছড়ি, খাগড়াছড়ি এবং রাঙামাটির নিয়ন্ত্রন নিতে সাহায্য করে তাদের। মুক্তিবাহিনী একে একে দখল হারায় বিভিন্ন স্থানের।

১৯ এপ্রিল বুড়িরহাটের প্রতিরক্ষা যুদ্ধে শহীদ হন ল্যান্স নায়েক মুনসী আবদুর রউফ (বীরশ্রেষ্ঠ), অসম সাহসিকতায় মৃত্যুবরণ করে প্রাণরক্ষা করেন খালেকুজ্জামানসহ বাকিদের। ২৭ এপ্রিল নানিয়াচর এলাকায় তাদের আক্রমণে শহীদ হন ক্যাপ্টেন আফতাব কাদেরUPDF (2) মং প্রু সেন২৮ এপ্রিল মগরাজা মংপ্রু সেনের সহায়তায় খাগড়াছড়িতে বিপুল বিক্রমে লড়েও গুলির অভাবে পিছু হটতে বাধ্য হয় মুক্তিবাহিনী। ২ মে রামগড়ে পতন ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এমএজি ওসমানী নিজে উপস্থিত থেকেও ঠেকাতে পারেননি এর পতন। [ তথ্যসূত্র: একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ : প্রতিরোধের প্রথম প্রহর/ মেজর রফিকুল ইসলাম (পিএসসি)/পৃ: ৪২-৪৭ ]

মুক্তিযুদ্ধের প্রায় অনেকখানি সময়ই ত্রিদিব রায় পার্বত্য অঞ্চলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে তার ক্যাম্পেইনিং চালিয়ে গেছেন। তার আহবানে সাড়া দিয়ে দলে দলে চাকমা যুবকেরা ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সে ভর্তি হতে শুরু করে। বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বের হওয়া হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র-৯ম খন্ড’ ৯৩ পৃষ্ঠায় মীর শওকত আলীর (বীর উত্তম) উদ্ধৃতিতে লেখা হয়েছে, ‘চাকমা উপজাতিদের সাহায্য হয়ত আমরা পেতাম। কিন্তু রাজা ত্রিদিব রায়ের বিরোধিতার জন্য তারা আমাদের বিপক্ষে চলে যায়।’ এ প্রসঙ্গে মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম বীর প্রতীক তার ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ পরিস্থিতি

জেনারেল ইব্রাহীম বীর প্রতীক
জেনারেল ইব্রাহীম বীর প্রতীক

মূল্যায়ন’ বইয়ে বিস্তারিত লিখেছেন, ‘উপজাতীয় যুবকদের কিছুসংখ্যক মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেও অধিকাংশই পকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক গঠিত সিভিল আর্মড ফোর্স বা সিএএফ (রাজাকার বাহিনী হিসেবে পরিচিত)-এ যোগ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তৎপরতায় অংশ নেয়। তৎকালীন রাজাকার বাহিনীতে চাকমাদের সংখ্যাই বেশি ছিল। অনেকেই বেতন এবং অস্ত্রের লোভে সিএএফে যোগ দেয়।

রাজা ত্রিদিব রায় তার সার্কেলে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে গিয়ে জনগণকে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য প্রচারণা চালাতে থাকেন। চাকমা যুককেরা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, পানছড়ি প্রভৃতি এলাকায় স্থাপিত পাকিস্তানি ট্রেনিং ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। উপজাতিদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন রাজশাহী বিভাগ থেকে পালিয়ে আসা ইপিআরের হাবিলদার মি. নলিনী রঞ্জন চাকমা এবং হাবিলদার মি. অমৃত লাল চাকমা। এরা প্রশিক্ষণের পাশাপাশি দোভাষীর কাজও করতেন। উপজাতি যুবকেরা টেনিং ক্যাম্প ৩০৩ রাইফেল, কারবাইন, স্টেনগান, এল এম জি চালনার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতেন।

অনুগতদের লেলিয়ে দিয়েছেন। তারা পাকিস্তানীদের পথ দেখাচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান দেখাচ্ছে, ফাঁদ পেতে ধরতে সাহায্য করছে। আর তিনি অপেক্ষায় আর বড় খেলার। অংশু প্রু চৌধুরীর মতো গভর্নর মালেকের প্রাদেশিক মন্ত্রীসভায় যোগ দেওয়া তার জন্য অসম্মাণ। নভেম্বরে এলো সেই সম্মাননা। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার বিশেষ দূত হিসেবে তিনটি দেশে সফরে গেলেন রাজা ত্রিদিব রায়। এই সফরের খবর দিয়ে ২৪ নভেম্বর জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ‘প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত হিসেবে ত্রিদিব রায় তিনটি দেশ সফর করিবেন’ শিরোনামে লেখা হয় :পূর্ব পাকিস্তান হইতে নির্বাচিত এমএনএ রাজা ত্রিদিব রায় প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত হিসেবে সিংহল, নেপাল ও থাইল্যান্ড সফর করিতেছেন বলিয়া সরকারীভাবে ঘোষণা করা হয়।

রাজা ত্রিদিব রায় এই সকল দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধানের নিকট পূর্ব পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করিবেন। ইহা ব্যাতীত তিনি পাকিস্তানের আভ্যন্তরীন ক্ষেত্রে ভারতের অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং আমাদের সীমান্তে ভারতীয় সৈন্যদের সমাবেশ ও আমাদের এলাকায় গোলাবর্ষনের ফলে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে শান্তি ও নিরাপত্তার উপর যে বিপদাশঙ্কা নামিয়া আসিয়াছে সে সম্পর্কেও তাহাদের অভিহিত করিবেন। আজ তিনি এখান হইতে যাত্রা করিয়াছেন। পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন ডিরেক্টরও তাহার সহিত রহিয়াছেন। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখযোগ্য, ২১ নভেম্বর রাজা ত্রিদিব রায় প্রেসিডেন্টের সহিত সাক্ষাত করেন।(হুবহু উদ্ধৃত)

এই সাক্ষাতের প্রেক্ষাপট রচিত হয় জেনারেল নিয়াজীর পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরে দৈনিক পত্রিকা, ১৪ অক্টোবর ১৯৭১)।পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাতকারে (১৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৬) ত্রিদিব রায় বলেছেন নভেম্বরে তাকে দক্ষিন-এশিয়া সফরে যেতে হবে এটার কথা তিনি আগেই জানতেন। সে উপলক্ষ্যেই ৯ নভেম্বর তিনি রাঙামাটি ছাড়েন। ১০ তারিখ নিয়াজীর এক ভোজসভায় যোগ দেন। তার ভাষায়:
প্রতিবাদের কথাও লেখা হয়েছে যেখানে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, গণহত্যা-ধর্ষণের সাফাই গাওয়া একজন লোক কিভাবে শান্তিবাদী বৌদ্ধধর্মের প্রতিনিধিত্ব করে!

ত্রিদিবকে বোঝানোর চেষ্টা হয়েছিলো। ডনকে দেওয়া প্রাগুক্ত সাক্ষাতকারে ত্রিদিব রায় জানাচ্ছেন থাইল্যান্ড সফরের সময় ব্যাংককে খুররম খান পন্নী তাকে পাকিস্তানের পক্ষত্যাগ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে সমর্থন করার প্রস্তাব দেন। পন্নী তখন পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে ফিলিপাইনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু ত্রিদিব রায় দৃঢ়ভাবে তাকে প্রত্যাখান করেন। পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে তার সেই বড়াইপনার বয়ান এরকম: পদের ভারে মোহাবিষ্ট ত্রিদিব রায় কারো কথাই শোনেননি। এমনকি তার মায়েরও না। ’৭২ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ চেয়ে বাংলাদেশের আবেদন ঠেকাতে পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার মা বিনীতা রায়কে নিউইয়র্কে পাঠান ছেলেকে বুঝিয়ে সুজিয়ে ফিরিয়ে আনতে। ত্রিদিব তাকেও প্রত্যাখান করেন। তারপর সাফল্যের সঙ্গে মিশন শেষ করে রেডকার্পেট অভ্যর্থনা পান। তাকে স্বাগত জানাতে পুরো মন্ত্রীপরিষদসহ বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন।
আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য রয়েছে ত্রিদিবের এই স্মৃতিকথায়। ভুট্টো নাকি তাকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। তবে পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী সেজন্য তাকে মুসলমান হতে হবে! ধর্মান্তরিত হওয়ার ওই প্রস্তাবে ত্রিদিব সায় দেননি। দিলে নেহাত মন্দ হতো না। ঘাতক-দালাল শিরোমনি ত্রিদিবের নাগরিকত্ব বাতিল করে দিয়েছিলো সরকার (১৯৭২ সালের  যেখানে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে সহায়তার অভিযোগে দালাল আইনে অভিযুক্তদের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয় দালালদের সে তালিকায় ৮ নম্বরে ছিলো ত্রিদিব রায়ের নাম। তাতে থোড়াই এসেগেছে তার। ত্রিদিব রায় বসে থাকেননি। পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য আর বাংলাদেশের প্রতি বিদ্বেষ সমানে চালিয়ে গেছেন।

Prof_A.Rouf
বীরশ্রেষ্ট মুন্সী আব্দুর রউফ

পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টিতে তার ও তার অনুগতদের ইন্ধন নিয়ে ’৭৩ সালে পত্রিকায় সিরিজ রিপোর্ট হয়েছে। সেই লোকটা মরে গেছে। পাকিস্তানের একজন গর্বিত নাগরিক হিসেবেই মৃত্যু হয়েছে তার। কিন্তু বাঙালীদের চোখে একজন পাকিস্তানী দালাল হিসেবে, যার ক্ষমা মৃত্যুতেও নেই। দেশে যে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে, যেই অপরাধে অন্যান্ন যুদ্ধাপরাধীরা বিচারের সম্মুখীন, সেই একই অপরাধে অপরাধী রাজা ত্রিদিব রায়ও। তার হাতে লেগে আছে বীরশ্রেষ্ট মুন্সী আবদুর রউফের রক্ত। ইফতেখার, শুক্কুর, কামাল, শফিক, ইলিয়াস, মামুনদের নৃশংস হত্যায় সহযোগিতার দায় তার কাঁধেও। বিশ্বের কাছে বাংলাদেশে গণহত্যা-ধর্ষণ-বাঙালীদের বাস্তুহারা করার পক্ষে সাফাই গাওয়ার অপরাধ তার প্রমাণিত।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার পুরস্কার ভোগ করা এবং আজীবন পাকিস্তানী থেকে মৃত্যুবরণ করা একজনকে এই বাংলার মাটিতে সমাহিত করতে দেওয়াটা হয়তো চাকমাদের সঙ্গে সম্পর্কের প্রেক্ষিতে মানবিক, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে পাশবিক। সবক্ষেত্রেই তার যোগ্যতা হিসেবে দেখানো হয়েছে ৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করা একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে, সেই আওয়ামী লীগ, ৭০এর নির্বাচনের প্রেক্ষিতে যে ৭১এর মুক্তিযুদ্ধ তার রাজনৈতিক নেতৃত্বের উত্তরাধিকার বয়ে বেড়ায়, ঠিক কিভাবে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারে তার পর্যালোচনা হওয়া প্রয়োজন। এমন সিদ্ধান্ত যুদ্ধাপরাধের বিচারকে বুড়ো আঙ্গুল শুধু দেখায়নি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিকও। এ আমাদের তিরিশ লাখ শহীদ এবং লাখো বীরাঙ্গনার অপমানকে উপহাস। সরকারের এই সিদ্ধান্তে তীব্র ধিক্কার এবং তা বাস্তবায়ন প্রতিরোধের ঘোষণাও আমার এই প্রতিবাদ। [highlight]সম্পাদক ও প্রকাশক নুরুল আলম[/highlight]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *