সশস্ত্র গ্রুপের সাথে ইউপিডি ও এফজেএসএস -এর সমঝোতা

55555জেএসএস-ইউপিডিএফ-300x150

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ তিন পার্বত্য জেলার দুর্গম পাহাড়ে তৎপরতা শুরু করেছে ৭ সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন। এগুলো হচ্ছে আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (এআরএসও), ন্যাশনাল ইউনাইটেড পার্টি অব আরাকান (এনইউএ), আরাকান লিবারেশন পার্টি (এএলপি), পিপলস পার্টি অব আরাকান (পিপিএ), আরাকান আর্মি (এএ), আরাকান রোহিঙ্গা ইসলামী ফ্রন্ট (এআরআইএফ), ডেমোক্রেটিক পার্টি অব আরাকান (ডিপিএ)।

সম্প্রতি এ তালিকায় নতুন করে যোগ হয়েছে ধর্মীয় উগ্রপন্থি সংগঠন ৯৬৯। এসব সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে হাত মিলিয়েছে জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ’র সশস্ত্র গ্রুপের সদস্যরা। অস্ত্র প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রের ব্যবসা নিয়ে এরইমধ্যে বিদেশি সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করেছে ওই দুই সংগঠন।

পাহাড়ে বসবাসকারী শান্তিপ্রিয় ও নিরীহ উপজাতীয়দের নানাভাবে প্রলোভন দেখিয়ে ওই দুই সশস্ত্র সংগঠন তাদের দল ভারি করছে। দলীয় কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি তাদের দিয়ে অস্ত্র আনা-নেয়ার কাজ করছে বলে তিন পার্বত্য জেলা নিয়ে কাজ করা গোয়েন্দারা জানিয়েছেন।

এসব প্রসঙ্গে ওই দুই সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। এম কে-১১, জার্মানির তৈরি এইচ কে-৩৩, রাশিয়ার জি-৩, একে-৪৭, একে-২২, এম-১৬ রাইফেল, নাইন এমএম পিস্তল, চাইনিজ সাব- মেশিনগান, এসবিবিএল বন্দুক। এসবই বিদেশি অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে প্রায় নিয়মিত এসব অতাধুনিক অস্ত্র উদ্ধার করা হচ্ছে তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে। মানের দিক দিয়ে এসব অস্ত্র যেমন অত্যাধুনিক তেমনি দামের দিক দিয়েও ব্যয়বহুল।

স্থানীয় গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, পাহাড়িদের হাত ঘুরে এসব অস্ত্র এখন পৌঁছে যাচ্ছে দেশে সক্রিয় বিভিন্ন জঙ্গিদের হাতে। ব্যবহার হচ্ছে দেশবিরোধী সন্ত্রাসী কাজে। আটক জঙ্গিরা পাহাড় থেকে অস্ত্র সংগ্রহের বিষয়টি এরইমধ্যে স্বীকার করেছে। বিষয়টিকে রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

আরাকান আর্মি থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে আগ্রহী এক উপজাতি জানান, দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে প্রথমে আমাকে ঘরছাড়া করা হয়। এরপর ব্ল্যাকমেইল করে দলে ভেড়ানো হয়। পরে দুর্গম পাহাড়ের জঙ্গলে নিয়ে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তার সঙ্গে ১৫১ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

চলতি বছর ১১শ’ জনকে অস্ত্র প্রশিক্ষণের টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। মূলত রণকৌশল, অস্ত্র ধারণা, সমাজ-বিজ্ঞান ও শারীরিক চর্চা করানো হয় ট্রেনিংগুলোতে। স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জঙ্গিরা এ অঞ্চল থেকে অস্ত্র সংগ্রহকে নিরাপদ হিসেবে মনে করছে।

তিন পার্বত্য জেলার বেশ কয়েকটি স্থানকে অস্ত্র আসার রুট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্থানের মধ্যে রয়েছে বান্দরবানের থানচি ও নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্তবর্তী এলাকা, রাঙ্গামাটি জেলার বরকল উপজেলার চোট হরিণা, বড় হরিণা, বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক, জুরাছড়ির আন্দারমানিক, ফকিরাছড়ি, বিলাইছড়ি, খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার নারাইছড়ি, পানছড়ির দুদকছড়ি, কেদারাছড়া, মাটিরাঙ্গা উপজেলার আচালং, রামগড় উপজেলার বাগানবাজার, বড়বিল, রামগড় বাজার ইত্যাদি।

এসব স্থান রুট হিসেবে ব্যবহারের অন্যতম কারণ হিসেবে অরক্ষিত সীমান্তকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে ২৮১ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্তের এরইমধ্যে ১৩০ কিলোমিটার সুরক্ষিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে থাকা ১৯৮ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে ৮৫ কিলোমিটার সুরক্ষিত করা হয়েছে। এদিকে বিদেশি সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে হাত মিলিয়ে দিন দিন নিজেদের শক্তি বাড়াচ্ছে জেএসএস ও ইউপিডিএফ’র সশস্ত্র সদস্যরা।

সামরিক কাঠামো তৈরি করে তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছে তারা। তাদের রয়েছে নিজস্ব সেনাপ্রধান, আলাদা আলাদা কোম্পানি, বিভিন্ন উইং, শরীরে থাকে সেনাবাহিনীর পোশাক, হাতে অত্যাধুনিক ওয়াকিটকি, কাঁধে চকচকে ভারী ও দামি অস্ত্র। এরকম প্রায় দুই হাজার সদস্য রয়েছে পার্বত্য জেলাগুলোতে। তারা প্রত্যেকেই প্রশিক্ষণ পাওয়া দক্ষ ও ক্ষিপ্র।

ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলগুলোতে তাদের বিচরণ। শুধু পোশাক আর অস্ত্র নয় তাদের রয়েছে নিজস্ব পরিচয়পত্র, মুদ্রা ও পতাকা। পাহাড়ে জুম্মল্যান্ড ও স্বায়ত্ত শাসিত সরকার গঠনকে টার্গেট করে নীরবে সশস্ত্র কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেছে এসব সশস্ত্র সংগঠনগুলো।

সম্প্রতি ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নিজেদের পতাকা, মুদ্রা ও পরিচয়পত্রের প্রচারণা চালাচ্ছে তারা। এসব সশস্ত্র সংগঠনের তিনটি উইং খুবই শক্তিশালী। এগুলো হচ্ছে রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থ উইং।

সম্প্রতি এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে পার্বত্যাঞ্চলে ৩টি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের একেক এলাকায় একেক দলের প্রভাব ও আধিপত্যের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সমগ্র রাঙ্গামাটি জেলায়, খাগড়াছড়ি জেলার অল্প কিছু এলাকায় এবং বান্দরবানে জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের মোটামুটি প্রভাব ও আধিপত্য রয়েছে বলে জানা যায়।

অন্যদিকে ইউপিডিএফ’র আধিপত্য রয়েছে সমগ্র খাগড়াছড়ি জেলা, রাঙ্গামাটির কোনো কোনো এলাকা ও বান্দরবানের অল্প পরিমাণ এলাকায়। রিপোর্টে বলা হয়েছে, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে জেএসএস (সংস্কার)-এর মোটামুটি প্রভাব ও আধিপত্য থাকলেও রাঙ্গামাটিতে অল্প পরিমাণে প্রভাব রয়েছে বলে জানা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *