সারাদেশে লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন

22ডেস্ক রিপোর্ট : তীব্র দাবদাহের সাথে লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ সারাদেশের মানুষ। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে শিশু ও বয়স্ক মানুষদের। রাজধানীসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার কারণে এই অস্বস্তিকর গরম অনুভূত হচ্ছে। এ তাপপ্রবাহ আরো কয়েক দিন অব্যাহত থাকবে বলে আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। অতিরিক্ত গরমে হিট স্ট্রোকসহ, ঠান্ডা, ডায়রিয়াজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। দেশজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেছেন, আগামী চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবে। আশুগঞ্জের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ভেঙে পড়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুতের এ সংকট দেখা দিয়েছে বলেও জানান তিনি। তীব্র গরমের সাথে লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে সারাদেশ। ঢাকায় লোডশেডিং বাড়ছে। ঢাকার বাইরের অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।
প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পাওয়া না গেলে আগামীতে ঢাকাসহ জেলা পর্যায়ে লোডশেডিং আরও বাড়বে। এতে বাড়বে মানুষের দুর্ভোগ। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, আগামী ৩/৪ দিনে বৃষ্টির সম্ভাবনা কম, তাই গরমে কষ্ট পেতে হবে আরো কয়েকদিন। অনেকেই গরম থেকে বাঁচতে ডাব, সরবতসহ বিভিন্ন পানীয় পান করছেন। এদিকে গরমে পেটের পীড়া, জ্বরসহ ছড়িয়ে পড়ছে নানা রোগ। আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
একে তো প্রচুর জলীয়বাষ্পসহ তাপমাত্রা, তার ওপর প্রবল বাতাসের আর্দ্রতা- এই দুইয়ে মিলেই হাঁস-ফাঁস অবস্থা এখন সারা দেশের। প্রকৃতি আরেকটু চড়লেই তাপমাত্রা চলে যাবে ‘প্রবল তাপপ্রবাহে’। অবস্থা এখন এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যেন একটুখানি বৃষ্টির পরশ চাই-ই চাই। কিন্তু আবহাওয়ার পূর্বাভাস এ ক্ষেত্রে একেবারেই হতাশাজনক। পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, তিনদিনের মধ্যে বৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা নেই। ফলে তাপে আরো কয়েকদিন পুড়তে হবে দেশবাসীকে। গতকাল সোমবার সকালে আবহাওয়া কার্যালয়ের সর্বশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, ঢাকায় এখন তাপমাত্রা বিরাজ করছে ৩৬ ডিগ্রির বেশি। আর সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা রয়েছে খুলনা ও যশোরে। সেখানে বর্তমানে ৩৮-৩৯ ডিগ্রির মধ্যে ঘোরাফেরা করছে তাপ। অর্থাৎ আবহাওয়াবিদদের হিসাব অনুযায়ী,  এই তাপ যদি আর দুই ডিগ্রি চড়ে গিয়ে ৪০ ডিগ্রিতে দাঁড়ায়, তাহলে তাকে ‘প্রবল তাপপ্রবাহ’ ধরে নেয়া হয়। আবহাওয়াবিদ আবদুর রশিদ বিবিসিকে বলেছেন, ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম এবং বরিশাল বিভাগ পুরোটা হিট ওয়েভে বা তাপ প্রবাহের আওতায় আছে। এ ছাডা রাজশাহী অঞ্চলের রাজশাহী, পাবনা এবং অন্যদিকে নোয়াখালী ও কুমিল্লাতেও হিট ওয়েভ আছে। ফলে এখন যে তাপমাত্রা আছে সেটি আগামী দুই থেকে তিনদিন বজায় থাকবে। এর উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হবে না বলেই ধারণা আবদুর রশিদের। ভয়াবহ এই গরমের সাথে বেড়ে চলছে বিদ্যুতের লোডশের্ডিং।
ফলে মানুষের কষ্ট আরো বেড়েই চলছে। জানা গেছে, রবিবার সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ৭ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। এ সময় সারা দেশে চাহিদা ছিল ৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এতে সরকারি হিসাবেই ঘাটতি দাঁড়ায় ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। বেসরকারি হিসাবে এ ঘাটতি ১৫শ থেকে ১৭শ মেগাওয়াট। এ কারণে দেশব্যাপী চরম লোডশেডিং করতে হচ্ছে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোকে। সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং করেছে আরইবি (পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড)। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেছেন, আগামী চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবে। আশুগঞ্জের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ভেঙে পড়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুতের এ সংকট দেখা দিয়েছে বলেও জানান তিনি। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা জানান। রমজান মাসে বিদ্যুতের কোনো সংকট হবে কিনা- জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমি বলতে পারি একটা ভালো পরিস্থিতির দিকে যাবে। সংকট তো থাকবেই, এখনো আছে।
ভালো পরিস্থিতি বলতে আগের থেকে ভালো। তিনি বলেন, যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। আমরা যে প্রবণতায়, বলবো না খুব ভালো অবস্থায় আছি। ভালো অবস্থায় যেতে আরও তিন বছর লাগবে। ট্রান্সমিশনে এখন ঘাটতি রয়ে গেছে, কাজ চলছে। চায়না সরকারের কাছ থেকে যে অর্থ পাওয়ার কথা তা অন প্রসেসিং। এ জন্য কাজ শুরু করতে হবে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বৃহৎ প্রকল্পগুলো এখনো আসেনি। আমি মনে করি দেশবাসী, গ্রাহক বিষয়টা বুঝতে চেষ্টা করবেন। নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ কবে পাবো- প্রশ্নে নসরুল হামিদ বলেন, ৪০০ মেগাওয়াটের প্ল্যান্ট ৭-৮ মাসের আগে আসবে না। তবে উত্তরাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে যে পাওয়ার প্ল্যান্ট রয়েছে সেগুলো ৪-৫ দিনের মধ্যে শুরু করে দেবো। সেটা কাভার করবো। নসরুল হামিদ বলেন, আমরা দেখছি ক্যাপাসিটি বেড়ে যাচ্ছে, একবার বৃষ্টি হলে চার হাজার মেগাওয়াটে নেমে যাচ্ছে, গরম পড়লে ১২ হাজার। বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্যাটার্ন পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। গরমে এসি ছাড়ছি, বৃষ্টিতে ঠান্ডা পড়ায় এসি বন্ধ করছি। এখনো ব্যবসায়ী লাইনগুলো ওরকমভাবে বিদ্যুৎ দিচ্ছে না। যদি ধরে নেই যে, ক্যাপটিভ পাওয়ারের প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চালু রাখছে, তাহলেও আমাদের বিদ্যুতের চাহিদা আরও বেড়ে যাবে। জানা যায়, ঢাকার চাহিদা মেটাতে গিয়ে তাদের সরবরাহ অনেকাংশে কাটছাঁট করেছে পিডিবি (বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড)।
এ কারণে ঢাকার বাইরের সমিতিগুলোতে গড়ে ৭-৮ ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হয়েছে। কোথাও কোথাও আরও বেশি। ঢাকাকে আলোকিত রাখতে রাতে বেশিরভাগ গ্রামকে রাখা হচ্ছে অন্ধকারে। বিদ্যুৎ সংকটে ঢাকার বাইরে অনেক শিল্পকারখানা সন্ধ্যার পর বন্ধ রাখতে হচ্ছে। দিনেও অধিকাংশ কল-কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে না আরইবি। কিন্তু এরপরও ঢাকার অনেক এলাকাই গতকাল সোমবার ও আগের কয়েকদিন অন্ধকারেই ছিল। রবিবার আরইবির বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু তারা পেয়েছে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটের মতো। সংস্থার প্রেস কনসালট্যান্ট তালুকদার রুমী বলেন, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না বলেই বাধ্য হয়ে তাদের লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তবে রমজানের আগে লোডশেডিং আরও সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি জানান। শনিবার রাতে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি সামিট পাওয়ারের বিবিয়ানা ইউনিট ২-এর ৩৪১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি। এছাড়াও বর্তমানে বন্ধ আছে এরকম বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো হল বিবিয়ানা ৩৪১ মেগাওয়াট, রংপুর ২০০ মেগাওয়াট, ভেড়ামারা ২১৪ মেগাওয়াট, বড়পুকুরিয়া ২১০ মেগাওয়াট, মেঘনাঘাট ৪২৫ মেগাওয়াট, সিরাজগঞ্জ ২২৫ মেগাওয়াট, আশুগঞ্জ ৩৬০ মেগাওয়াট।  বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, বর্তমানে সর্বোচ্চ ৯ হাজার ২১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড আছে। রমজানে এটা বাড়িয়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করা হবে। এজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি শুরু করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। লোডশেডিং করতে হলে আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট এলাকায় জানিয়ে দেয়া হবে। এজন্য অগ্রিম সিডিউল তৈরি করে সবাইকে জানানো হবে। তিনি বলেন, প্রথম রমজান থেকেই বিকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত সিএনজি স্টেশন বন্ধ রাখা হবে।
23তবে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এবারের পুরো রমজানজুড়ে গরম থাকবে। এতে সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেড়ে যাবে। সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর যে অবস্থা তাতে রমজানে সরকারের টার্গেট অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ১০ হাজার মেগাওয়াট করা সম্ভব হবে না। এতে রোজাদারদের ভোগান্তির মুখে পড়তে হবে। ইফতারি, তারাবি ও সেহরির সময় চাহিদা বেড়ে গেলে গ্রামের লোডশেডিং চরম আকার ধারণ করবে। : জানা যায়, গত বছর ২০ মে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ বছর ২০ মে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ হিসাবে গত বছরের তুলনায় চলতি বছর এই সময়ে তাপমাত্রা বেড়েছে। গরমে পেটের পীড়া, জ্বরসহ ছড়িয়ে পড়ছে নানা ধরনের রোগ। এ থেকে রক্ষা পেতে করণীয় সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, গরমে বাতাসে আর্দ্রতা বেশি। এ কারণে মশার উপদ্রব বেড়েছে। মশার কারণে চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু, ডায়রিয়া, আমাশয়ের মতো রোগ হচ্ছে। এছাড়া হঠাৎ করে তাপমাত্রা বাড়ার কারণে কল-কারখানায় যারা কাজ করেন, রোদে রাস্তাঘাটে বের হন তারা হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হতে পারেন। এ জন্য সচেতন থাকতে হবে। গরম থেকে বাঁচতে ডাবের পানি, বাসায়  তৈরি সরবত ও ওরস্যালাইন খাবার পরামর্শ দেন বিশিষ্ট এই চিকিৎসক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *