পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্রেকিং নিউজ

স্বাধীনতা সংগ্রামের ১ নং সেক্টর

                                                             মোহাম্মদ নুরুল আলম

( বিভিন্ন লেখখ দের মতামতের ভিত্তিতে স্বাধীনতা যুদ্ধের ১ নং সেক্টরের আংশিক ইতিহাস তুলে ধরা হলো)

আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ কোনো সামরিক অভিযান ছিল না; ছিল সাধারণ শোষিত মানুষের মুক্তির অকুতোভয় অসম সংগ্রাম। ধাপে ধাপে দখল হতে থাকা এই দেশকে মুক্ত করার প্রয়াসে এদেশের অগণিত নিষ্পেষিত প্রাণ চালিয়ে যাচ্ছিলো তাঁদের দুর্বার মুক্তিসংগ্রাম। কিন্তু ২৫ মার্চ থেকে চালানো পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নির্মম নৃশংসতার বিপরীতে সেগুলো ছিল অসংগঠিত ও বিচ্ছিন্ন কিছু ‘ব্যর্থ’ প্রতিরোধ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিরোধ যুদ্ধগুলো হচ্ছিলো সমন্বয়হীনভাবে আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে।

এমতাবস্থায় এসব স্বাধীনতাকামী, সাধারণ জনগণ, বাঙালি ইউনিট আর ‘বিদ্রোহী’ সামরিক সদস্যদের মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করাটা জরুরি হয়ে পড়ে। সেই লক্ষ্যে ৪ এপ্রিল সিলেটের হবিগঞ্জ মহকুমার সীমান্ত সংলগ্ন তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ডাক বাংলোয় কর্নেল এম এ জি ওসমানীর সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানকে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট ও যশোর- এই চারটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়। পরবর্তীতে অবশ্য এই চার অঞ্চল বিভক্তি থেকে সরে আসে নীতিনির্ধারকেরা। ১১ এপ্রিল শিলিগুড়ি বেতারকেন্দ্র থেকে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ সমগ্র দেশকে আটটি সামরিক অঞ্চলে বিভক্ত করে আটজন সেক্টর কমান্ডার নিয়োগের ঘোষণা দেন।

অবশেষে ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে বৃষ্টিস্নাত কলকাতার ৮নং থিয়েটার রোডে তাজউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক কনফারেন্সে সারা দেশকে সামরিকভাবে এগারোটি সেক্টরে ভাগ করা হয়। মূলত মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পর এটিই ছিল সেক্টর কমান্ডারদের প্রথম কনফারেন্স। সভায় লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) এম এ রবকে বাংলাদেশ ফোর্সেস-এর চীফ অব স্টাফ ও গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারকে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আর সর্বাধিনায়ক হিসেবে কর্নেল এম এ জি ওসমানীকে মনোনীত করা হয়।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামো বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস-সেক্টর এক,  মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে এগারোটি (প্রধানত) সেক্টরে ভাগ ছিল আমাদের রণাঙ্গন ১নং সেক্টর ছিল বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ-পূর্ব পার্শ্বে। ভৌগলিক দিক থেকে এই সেক্টর এলাকা বেশ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ছিল। এখানে একইসাথে পাহাড়, উপত্যকা, হ্রদ, নদী ও সমুদ্রসকাশের সমতলভূমি ছিল।  এসব কারণে এখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও তুলনামূলকভাবে বেশি হত। পাহাড় পরিবেষ্টিত থাকায় এ অঞ্চল গেরিলা যুদ্ধের জন্য বেশ উপযোগী ছিল। চলুন, ইতিহাসের পথ ধরে পিছনে ফিরে দেখে আসি রণাঙ্গনের ১ নং সেক্টরকে। প্রধান প্রধান নদ-নদী: সাঙ্গু, হালদা, ফেনী, মুহুরী, কর্ণফুলী, মাতামুহুরী, নাফ, মহেশখালী, বাকখালী, রাখিয়াং, কাসালং, মাইনি, চেংগী উল্লেখযোগ্য। পাহাড়শ্রেণী: আরাকান গিরিমালা, সীতাকুণ্ড পাহাড়, গোল পাহাড় ও বাটালী পাহাড় উল্লেখযোগ্য। পাহাড়বেষ্টিত থাকার কারণে এই অঞ্চল গেরিলাযুদ্ধের জন্য বেশ উপযোগী গুপ্তাশ্রয় (Hide-out) হিসেবে বিবেচিত ছিল।

যোগাযোগ ব্যবস্থা: চট্টগ্রাম ছিল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আর প্রধান সামুদ্রিক বন্দর। পাকিস্তানী হানাদারদের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ করাচি থেকে এই বন্দরেই খালাস করা হতো। এছাড়া চট্টগ্রামে একটি আধুনিক ও উপযোগী বিমানবন্দর সেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আমল থেকে চালু ছিল। কক্সবাজার ও চিরিংগায় ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমলে নির্মিত বিমানঘাঁটি। এছাড়া এই সেক্টরটির সাথে সড়কপথে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ ছিল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে। এই মহাসড়কের শুভপুর ব্রিজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। চট্টগ্রাম থেকে রেলপথ কুমিল্লা-আখাউড়া হয়ে সিলেট পর্যন্ত বিস্তৃত। অনেক স্থানেই রেলপথ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মাত্র কয়েক মিটার দূর দিয়ে চলেছে। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের সদর দপ্তর ছিল চট্টগ্রামে। অন্যদিকে সমুদ্রবন্দর ও চট্টগ্রাম নৌঘাঁটি থাকার ফলে এখানে বড় ধরনের নৌযুদ্ধ সম্ভব ছিল। অপারেশন জ্যাকপট এর একটি প্রোজ্জ্বল উদাহরণ।

এছাড়া চট্টগ্রামে ছিল বেতারকেন্দ্র আর কালুরঘাটে ট্রান্সমিটার কেন্দ্র। এই কালুরঘাট থেকেই মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এছাড়া এই সেক্টরে একটি অত্যাধুনিক ভূ-উপকেন্দ্র, টেলিযোগাযোগ কেন্দ্র ও আবহাওয়া দফতর স্থাপিত ছিল। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল। চট্টগ্রাম, তিন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা, কক্সবাজার আর ফেনীর মুহুরী নদীর পূর্ব পাড় পর্যন্ত ছিল ১ নং সেক্টরের বিস্তৃতি;  বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস-সেক্টর এক

সেক্টর এলাকা: বৃহত্তর চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা (রাঙামাটি, বান্দরবান এবং খাগড়াছড়ি), কক্সবাজার মহকুমা এবং নোয়াখালী জেলার ফেনী মহকুমার অংশবিশেষ (মুহুরী নদীর পূর্বপাড় পর্যন্ত) নিয়ে এই সেক্টরটি গঠিত হয়েছিল। এই সেক্টর এলাকার আয়তন প্রায় ১৮,৬০৩.৪৭ বর্গ কিলোমিটার। অঞ্চলটি ভৌগোলিকভাবে ২০°৩৫ˊ থেকে ২২°৫৯ˊ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯১°২৭ˊ থেকে ৯২°২২ˊ পূর্ব দ্রাঘিমা রেখার মধ্যে অবস্থিত। ১ সদর দপ্তর: হরিণা ত্রিপুরার হরিণায় ১ নং সেক্টরের বেইজ ক্যাম্পের সদর দপ্তরে সাংবাদিক পরিবৃত মুক্তিযোদ্ধাগণ; বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস-সেক্টর এক, সাব-সেক্টরের সংখ্যা: ৫টি। এগুলো হলো ঋষিমুখ, শ্রীনগর, মনুঘাট, তবলছড়ি ও ডিমাগিরি।

সেক্টর কমান্ডার: মেজর জিয়াউর রহমান (এপ্রিল থেকে ১০ জুন ’৭১) এবং মেজর রফিকুল ইসলাম- ইপিআর (১১ জুন থেকে ১৬ ডিসেম্বর ’৭১)। রামগড়ে বিএসএফ কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার ভি সি পান্ডের সাথে মেজর জিয়াউর রহমান; বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস- সেক্টর এক,  মেজর রফিকুল ইসলাম, ১১ জুন থেকে ১৬ ডিসেম্বরের চূড়ান্ত বিজয় অর্জন পর্যন্ত তিনি ছিলেন ১ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার; লক্ষ প্রাণের বিনিমিয়ে সেক্টর এ্যাডজুটেন্ট: ফ্লাইং অফিসার সাখাওয়াত হোসেন এবং ক্যাপ্টেন এনামুল হক। কোয়ার্টার মাস্টার: নায়েক সুবেদার সোবহান এবং ইঞ্জিনিয়ার একেএম ইসহাক। সেক্টর মেডিক্যাল অফিসার: ডা. রেজাউল হক। সেক্টর ট্রুপস্: নিয়মিত বাহিনী- ২,১০০ সৈন্য। এদের মধ্যে ১,৫০০ ইপিআর সদস্য, ৩০০ জন সেনাবাহিনীর, ২০০ পুলিশ এবং ১০০ নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্য।

গণবাহিনী: ২০,০০০ জন। এর মধ্যে ৮,০০০ গেরিলা ছিল ১৩৭টি দলে সুসংগঠিত অ্যাকশন গ্রুপ। গেরিলাদের ৩৫% এবং সেক্টর ট্রুপসের সবাইকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করা হয়। অপারেশনে যাবার পূর্বে একদল বীর মুক্তিযোদ্ধাকে অপারেশন সংক্রান্ত ব্রিফিং দিচ্ছেন শ্মশ্রুমণ্ডিত সেক্টর কমান্ডার মেজর রফিকুল ইসলাম; © বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস-সেক্টর এক,

সাবসেক্টরসমূহ

ঋষিমুখ সাবসেক্টর: মুহুরী নদীর অববাহিকায় অবস্থিত এলাকাটির তিন পাশে ভারত। এ অঞ্চলে বেশ কয়েকটি বিওপির অবস্থান ছিল; যেমন- আমজাদহাট, পূর্বদেবপুর, দক্ষিণ যশপুর, ছাগলনাইয়া, চম্পকনগর, বল্লভপুর, ইত্যাদি। এই সেক্টরের ভিতর দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মহাসড়ক ও রেলপথ চলে গেছে। চট্টগ্রাম এলাকা থেকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এ সকল রাস্তা ব্যবহার করত। আয়তন: ৩০০ বর্গ কিলোমিটার। সাব-সেক্টর কমান্ডার: ক্যাপ্টেন শামসুল হুদা বাচ্চু দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: পরশুরাম, দেবপুর, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া, অনন্তপুর, সোনাপুর, কোলাপাড়া, মনতলা, মোহাম্মদপুর, আমজাদহাট, মুন্সীরহাট, পূর্বদেবপুর, পূর্বমধুগ্রাম, দক্ষিণ যশপুর, মহামায়া, মোকামিয়াম, রাধানগর, শুভপুর, গুতুমা, গোপাল, কাশীপুর ইত্যাদি।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ: গুতুমা রেইড (১৬ জুলাই), বাগার বাজার রাজাকার ক্যাম্প ও দেবপুর অ্যামবুশ (৩১ জুলাই), করেরহাট-ফেনী-ছাগলনাইয়া অপারেশন (৪-৬ আগস্ট), চাঁদগাজী বাজার এলাকা অ্যামবুশ (১৮ আগস্ট), চম্পকনগর বিওপি আক্রমণ (২০ সেপ্টেম্বর), চম্পকনগর বিওপি আক্রমণ (২২ সেপ্টেম্বর), ফেনী-বিলোনিয়া সড়কে রেলওয়ে ব্রিজ ধ্বংস (২৫ সেপ্টেম্বর), মুহুরী নদীসকাশে রণাঙ্গন (৩ অক্টোবর), মদুনাঘাট বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন ধ্বংস (৬ অক্টোবর), ছাগলনাইয়া-বিলোনিয়া সড়কে ব্রিজ ধ্বংস (৭ অক্টোবর), সলিয়াদীঘি যুদ্ধ (৭ নভেম্বর), দক্ষিণ বিলোনিয়া মুক্তকরণ (২১ নভেম্বর), করিমাটিলায় সংঘর্ষ (৩ ডিসেম্বর)। ঋষিমুখ সাব-সেক্টর; ।

শ্রীনগর সাব-সেক্টর:  আয়তনে ছোট হলেও এই সাব-সেক্টরটি বেশ গুরুত্ববহ ছিল। কারণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রেলসড়ক এই সাব-সেক্টরের মধ্য দিয়েই প্রবেশ করেছে। এর কেবল উত্তরাংশ ভারতের সাথে যুক্ত। এখানে প্রাথমিক প্রতিরোধ যুদ্ধ ও সর্বপ্রথম ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। ফেনী নদী এই সাব-সেক্টরের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে।

শ্রীনগর সাব-সেক্টর ট্রেনিং ক্যাম্প;  বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস-সেক্টর এক, পৃষ্ঠা ৪৫১ শ্রীনগর সাব-সেক্টরে প্রশিক্ষণরত মুক্তিযোদ্ধাগণ; © বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস-সেক্টর এক, পৃষ্ঠা ৪৫১ আয়তন: ৫টি সাব-সেক্টরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে ছোট ছিল; প্রায় ২০০ বর্গ কিলোমিটার।

সাব-সেক্টর কমান্ডার: প্রথমে ক্যাপ্টেন অলি আহমদ, পরে কিছুদিন ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান এবং শেষে ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমান এপ্রিলের প্রথম দিকে, শ্রীনগরে ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের কর্মকর্তাদের সাথে ভারতের বিএসএফ কর্মকর্তাদের বৈঠক; © বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস-সেক্টর এক, পৃষ্ঠা ৪৪৮ দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: করেরহাট, জোরারগঞ্জ, হিঙ্গুলী, ধুম, কাটাছড়া, ওসমানপুর ও দুর্গাপুর।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: এখানে সংঘর্ষ তেমন একটা হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রটি ছিল করেরহাট (নভেম্বর)। শ্রীনগর সাব-সেক্টর © বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস-সেক্টর এক, পৃষ্ঠা ২৬৫ তবলছড়ি সাব-সেক্টর অবস্থানগত দিক বিশ্লেষণপূর্বক দেখা যায় যে, এই অঞ্চলে একইসাথে পাহাড় ও সমতল ভূমি রয়েছে। ’৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনীর ১নং সেক্টরে প্রবেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নাজুক করতে এই সাব-সেক্টরের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। উত্তাল মার্চের শেষলগ্নে কুমিরায় এক দুর্ধর্ষ প্রতিরোধযুদ্ধ হয় যা কিনা এই সাব-সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। তবে চট্টগ্রাম জেলার মীরসরাই ও সীতাকুণ্ড থানার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত এই এলাকাটি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেকটা বিপদজনক ছিল, কারণ ভারত সীমান্তে খুব তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার কোনো রাস্তা ছিল না এখানে। এই অঞ্চলের একদিক ছিল সন্দ্বীপ প্রণালীর সাথে যুক্ত।

আয়তন: ৭০০ বর্গ কিলোমিটার সাব-সেক্টর কমান্ডার: সুবেদার আলী হোসেন। দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: সীতাকুণ্ড, বাড়বকুণ্ড, কুমিরা, মীরসরাই, পানছড়ি ও লক্ষ্মীছড়ি। উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: সীতাকুণ্ড, বাড়বকুণ্ড, কুমিরা ও মীরসরাই। উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ: কুমিরার প্রতিরোধ যুদ্ধ (২৬-২৮ মার্চ), বড়তাকিয়া ও মীরসরাই অপারেশন (২৩ জুলাই), পাতাকোট অ্যামবুশ (১০ আগস্ট), সুফিয়া রোডের যুদ্ধ (১০ আগস্ট), মীরসরাই রেললাইন অপারেশন (২৮ আগস্ট), ওসমানপুর-লোহারপুলের যুদ্ধ (১৭ অক্টোবর), চামলাশিয়া অ্যামবুশ (১২ নভেম্বর), মীরসরাই রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ (২৪ নভেম্বর), কাটিরহাটে যুদ্ধ (৪ ডিসেম্বর)। তবলছড়ি সাব-সেক্টর; © বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস-সেক্টর এক, পৃষ্ঠা ২২৫

ডিমাগিরি সাব-সেক্টর, ৫টি সাব-সেক্টরের ভিতর যে তিনটি চট্টগ্রামের মধ্যে ছিল তার অন্যতম ছিল উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত এই ডিমাগিরি সাব-সেক্টর। এখানের বাগানবাজার ও অন্যান্য দু’একটি স্থানে বিওপির ঘাঁটি ছিল। ফলে এর বাগানবাজার অংশটি (উত্তরাংশ) কেবল ভারতসংলগ্ন ছিল। আয়তন: ১,০০০ বর্গ কিলোমিটার। সাব-সেক্টর কমান্ডার: জনৈক সুবেদার। দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: ফটিকছড়ি, নাজিরহাট, রাউজান, বাগানবাজার ও হাটহাজারী। উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: সুলতানপুর, রাউজান, ফটিকছড়ি, সোয়াবিল, বাগানবাজার ইত্যাদি।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ: মদনঘাটের বিদ্যুৎ স্টেশন ধ্বংস (১১ সেপ্টেম্বর), বাগানবাজার রেইড (১১ অক্টোবর), আন্ধারমানিক রেইড (৫ নভেম্বর), ফটিকছড়ি পুলিশ স্টেশন রেইড (১৭ নভেম্বর), নাজিরহাট যুদ্ধ (৯ ডিসেম্বর) ইত্যাদি। ডিমাগিরি সাব-সেক্টর; © বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস-সেক্টর এক, পৃষ্ঠা ২৪৩ মনুঘাট সাব-সেক্টর বাংলাদেশের সর্ব পূর্বে অবস্থিত এই সাব-সেক্টরের সমগ্র পশ্চিমাংশ ভারত লাগোয়া ছিল। ফলে মুক্তিযোদ্ধারা সুযোগ বুঝে ভারতীয় ভূ-খণ্ডে চলে যেতে পারতো। এই অঞ্চলটি পাহাড়-পর্বতের আধিক্যহেতু গেরিলাযুদ্ধের উপযোগী ছিল। এছাড়া চেংগী নদীর অবস্থানের কারণে মুক্তিযোদ্ধারা বেশ সুবিধা পেত। আয়তন: ৫টি সাব-সেক্টরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড়; প্রায় ১,২০০ বর্গ কিলোমিটার। সাব-সেক্টর কমান্ডার: যথাক্রমে ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমান, ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান এবং লেফটেন্যান্ট ফজলুর রহমান। দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: রামগড়, হেঁয়াকো, মহালছড়ি, খাগড়াছড়ি, মানিকছড়ি ও মাটিরাঙ্গা। রামগড়ে মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থান; © বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস-সেক্টর এক, পৃষ্ঠা ৪৪৯ রামগড়ে নিয়ে আসা গ্রেফতারকৃত পাকিস্তানী সৈন্য; © বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস-সেক্টর এক, পৃষ্ঠা ৪৫ উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: রামগড়, হেঁয়াকো, মহালছড়ি, মানিকছড়ি, ভাইবোনছড়া, পানছড়ি ইত্যাদি।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ: হেঁয়াকোর যুদ্ধ (২৭ জুলাই), রামগড় আক্রমণ (১৩-১৫ আগস্ট), বিলাইছড়ি ও পানছড়ি অ্যামবুশ (যথাক্রমে ১ ও ২ নভেম্বর), ভাইবোনছড়া ও পানছড়ি মুক্তকরণ (১০ ডিসেম্বর)। রামগড়ে ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাথে ক্যাপ্টেন অলি আহমদ; © বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস-সেক্টর এক, পৃষ্ঠা ৪৪৯ মনুঘাট সাব-সেক্টর; © বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস-সেক্টর এক, পৃষ্ঠা ২৫৭ ১নং সেক্টরে মাত্র ৫টি সাব-সেক্টর গঠন করা হলেও এই অঞ্চলের কিছু এলাকা সাব-সেক্টরবহির্ভূত ছিল। এসব এলাকাতেও কিন্তু যুদ্ধ হয়েছে। এ সকল এলাকায় যুদ্ধ করেছেন মূলত স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাগণ এবং পরবর্তীতে কিছু বিএলএফ-এর সদস্যরা। যেসব এলাকা এমন ছিল সেগুলো হল- কক্সবাজার ও রাঙামাটি জেলার প্রায় সমস্ত এলাকা, চট্টগ্রাম জেলার ১৪টির মধ্যে প্রায় ৯টি থানা। এখানে সংগঠিত উল্লেখযোগ্য যুদ্ধগুলো ছিল-

আনোয়ারা থানাঃ সার্জেন্ট মহি আলমের শেষ অপারেশন (নভেম্বর), আনোয়ারা থানা আক্রমণ, মেরিন একাডেমী আক্রমণ; বাঁশখালী থানাঃ গুনাগুরি ক্যাম্প রেইড; বোয়ালখালী থানাঃ অপারেশন ধোয়াছড়ি, বোয়ালখালীর যুদ্ধ, গোমদন্ডী ট্রেন অপারেশন (১৪ আগস্ট); পটিয়া থানাঃ বশরত নগর অপারেশন, ধলঘাট অপারেশন; সাতকানিয়া থানাঃ সাতকানিয়া কলেজ আক্রমণ ও রেলওয়ে ব্রিজ ধ্বংস (২-৮ আগস্ট), করলডেঙ্গা পাহাড়ের যুদ্ধ, বেঙ্গুরা স্টেশন অপারেশন;

রাঙ্গুনিয়া থানাঃ রাঙ্গুনিয়া থানা আক্রমণ (১৮ আগস্ট), কর্ণফুলী পেপার মিলে সাপ্লাই বন্ধ, গোমাই ব্রিজ ধ্বংস, চন্দ্রঘোনা থানা আক্রমণ, রাবার বাগানে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের সাথে যুদ্ধ; সন্দ্বীপ থানাঃ মাইটভাঙ্গা পুলিশ ক্যাম্প আক্রমণ (৩১ আগস্ট); ফটিকছড়ি থানাঃ ফটিকছড়ি-যুইগ্যাছোলার যুদ্ধ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর)

উপর্যুক্ত যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ ছাড়াও চট্টগ্রাম শহর ও শহরতলী এলাকায় কিছু উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল- কৈবল্যধাম রেলসেতু অপারেশন (৪ এপ্রিল), আগ্রাবাদ বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন অপারেশন (৫ আগস্ট), আন্ধারমানিক ও অভারন রেইড (৯ আগস্ট), সিডিএ কলোনি ও আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংক অপারেশন (আগস্ট), চট্টগ্রাম কোর্টবিল্ডিং অপারেশন (৮ সেপ্টেম্বর), অপারেশন আউটার অ্যাংকর (২২ সেপ্টেম্বর), পতেঙ্গা পোর্ট অপারেশন (২৩ সেপ্টেম্বর), অপারেশন জাতিসংঘ গ্যারেজ (সেপ্টেম্বর), স্টেট ব্যাংক অপারেশন (১ নভেম্বর), ফায়ার ব্রিগেড অপারেশন (নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ), চট্টগ্রাম কলেজ ও নেভী হেডকোয়ার্টার অপারেশন (২৪ নভেম্বর), হোটেল আগ্রাবাদ অপারেশন (নভেম্বর), ডিসি অফিস অপারেশন, আগ্রাবাদ ওয়াটার পাম্প অপারেশন (নভেম্বর), অপারেশন শাওনঘাটা ট্রান্সফরমার (৭ ডিসেম্বর), অপারেশন ফয়েজ লেক, কাট্টলী ট্রেন অপারেশন ইত্যাদি।কৈবল্যধামে মুক্তিযোদ্ধাদের মাইনের আঘাতে পাক বাহিনীর ধ্বংসপ্রাপ্ত পেট্রোল ট্রেন; © বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস-সেক্টর এক, পৃষ্ঠা ৪৫৮

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *