ব্রেকিং নিউজ
Home » অন্যান্য » দোস্ত মোহাম্মদ চৌধুরীর লেখনীতে মুক্তিযুদ্ধ

দোস্ত মোহাম্মদ চৌধুরীর লেখনীতে মুক্তিযুদ্ধ

::নুরুল আলম:: সংখ্যা ২
ভাষা সংগ্রাম থেকেই আমাদের স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সুত্রপাত। চুড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকন্ঠে ঘোষনা করে ছিলেন, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”।
পূর্ব পরিচয়ের সুবাদে সাবরুমের(বর্তমানে ত্রিপুরা রাজ্যের মহকুমা) কংগ্রেস নেতারা মরহুম সুলতান সাহেবের অনুরোধে গোলা বারুদ সংগ্রহের দায়িত্ব গ্রহন করেন। ১ এপ্রিল ১৯৭১ সালে ভারত সরকার রামগড়ের অনুকুলে দুই ট্রাক গোলা বারুদ ও যুদ্ধের সরঞ্জাম সাহায়ে হিসাবে পাঠিয়ে দেয়। ঐ সময় আমি ও নুর বক্স মিঞা ৩২ টি জীপ(তৎকালীন একমাত্র যানবাহন খোলা জীপ বা চাঁদের গাড়ি) নিয়ে রামগড়ে উপস্থিত ছিলাম। যার দরুন খুব অল্প সময়ের মধ্যে সিপাহী ও গোলা বারুদ গুলি চট্টগ্রামের সরকার হাট, হাটহাজারী, কালুর ঘাট ও পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই ও চন্দ্র ঘোণায় পাঠাইতে সক্ষম হই।
কয়েকদিন পরেই শুরু হল গণজামায়েত। চন্দ্রঘোনা কাপ্তাই ও রাঙ্গামাটির সম্মিলিত ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক জনতা রাঙ্গামাটি, মহালছড়ি হয়ে খাগড়াছড়ি আসে। তাঁদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করা এবং প্রশিক্ষণের জন্য জীপ যোগে রামগড় হয়ে ভারতে পাঠানোর দায়িত্ব পড়ে খাগড়াছড়ি সংগ্রাম কমিটির উপর। এর জন্য প্রতিদিন খাগড়াছড়ি বাসির সাহায্য নিয়ে লঙ্গর খানা গড়ে, ১৫০ হইতে ২০০ জনের খাবার ব্যবস্থা করি।
১৯৭১ এর এপ্রিলের প্রথম দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক সৈয়দ হাসান, তৌফিক ইমাম খাগড়াছড়িতে আসেন এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। এরই মাঝে মেজর জিয়াউর রহমান (সাবেক প্রেসিঃ) কয়েকজন সামরিক অফিসার নিয়ে খাগড়াছড়ি আসেন। তার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য ছিলেন অলী আহম্মদ (কর্ণেল অলী আহম্মদ বীর বিক্রম) তারানুর বক্স মিঞা ও আমার সাথে সাক্ষত করে ঐ দিন রাত্রে রামগড় চলে যান।
এদিকে রামগড়ে নেতাদের যুদ্ধের পরিকল্পনা করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে। কারণ মাত্র দুইজন সুবেদার এই লাইনে কাজ করেন। ২ এপ্রিল রামগড় টেলিফোন এক্সচেঞ্জের কয়েকজন অপারেটার কে বাজার করার টাকা দেয়ার হলে একমাত্র লাইনম্যান সোলেমান ব্যতীত বাকী অপারেটাররা পালিয়ে যায়। স্বল্প সময়ের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাবু রনজিৎ দেব বর্মন, বাবু বিজয় কুমার সাহা, জীতেন্দ্র মজুমদার ও মোহাম্মদ সিরাজুল হককে দিয়ে মরহুম সুলতান আহাম্মদ রামগড় পতনের পূর্ব পর্যন্ত টেলিফোনের কাজ চালান। উল্লেখ্য যে, রামগড় পতনের সময় লাইন ম্যান সোলেমান টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি উঠিয়ে সাবরুমে নিয়ে যায়।
৪ঠা এপ্রিল বিকালে ডি,সি তৌফিক ইমাম ও মেজর জিয়াউর রহমান রামগড়ে উপস্থিত হন। রামগড়ের নেতৃবৃন্দ মনে মনে আনন্দিত হইল। এই ভেবে যে যুদ্ধের পরিকল্পনা তৈয়ারীতে একজন অভিজ্ঞ মেজর পাওয়া গেল। ডি,সি সাহেবের আর্থিক সাহায্যে রামগড় লঙ্গর খানার বোঝা কিছুটা হালকা হয়। ষ্টোর পরিচালনার দায়িত্ব ছিলেন স্থানীয় পশু ডাক্তার বাবু বি,কে দাস। রান্নার দায়িত্ব ছিলেন মৌলভী বজলুর রহমান ও জনাব এ,বি,ছিদ্দিক। তারা তাদের দায়িত্ব অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে পালন করে ছিলেন। ভারতের হরিণার ইয়থ ক্যাম্পেও। এর মধ্যে মেজর রফিকুল ইসলাম(১ নং সেক্টর কমান্ডার ও সাবেক স্ব-রাষ্ট মন্ত্রী) আগরতলা হইতে রামগড়ে আসেন। এইবার দুই মেজর (মেজর জিয়াউর রহমান ও মেজর রফিকুল ইসলাম) মিলিতভাবে কাজ শুরু করেন। তাদের কার্যালয় ছিল বর্তমান রামগড় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কক্ষে। এদিকে বহু দামাল ছেলে সামরিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য আগ্রহী। কিন্তু প্রশিক্ষকের অভাব দেখা দেয়। তখন বাংলার এক আকুতো ভয় ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের ৯ এপ্রিল প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নেন। ১০ এপ্রিল থেকে পূর্ণ মাত্রায় প্রশিক্ষণ চলতে থাকে। এরই মধ্যে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আসতে আরম্ভ করল রামগড়ে।
যারা এই পথে এলেন তারা হলেন, এম, ওহাব এম এ হান্নান আব্দুল্লাহ আল হারুন, মির্জা আবুল মনছুর, ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন,(সাবেক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী) প্রফেসার খালেদ, মাইন শিক্ষাবিদ, ডাঃ এ, আর মল্লিক, ছৈয়দ আলী আহসান, চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার(তৎকালীন) মানিকছড়ি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডাঃ এস,বি বিশ্বাস, খাগড়াছড়ি ডাঃ সিরাজুল ইসলাম আরও অনেকেই। কয়েকজন ডাক্তার রামগড়ে আসায় আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য চিকিৎসা সুবিধা পাওয়া গেল।
মানিকছড়ির মংরাজা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন গরুর গাড়ীতে করে রামগড়ে পাছাতে লাগলেন চাউল, ডাউল, তরী-তরকারী। বাংলাদেশ সরকারের প্রতি অনুগত প্রকাশ করে দিলেন বৈদেশিক মুদ্রা । যা ঐ সময় অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য যোগ দিতে লাগল আরও অনেক যুদ্ধ বিশারদ। তাদের মধ্যে ছিল ক্যাপ্টেন মাহুফুজুর রহমান, ক্যাপ্টেন আলী, ক্যাপ্টেন সুবেদ আলী ভুঞা, গ্রুপ ক্যাপ্টেন সুলতান মাহামুদ। সময়ের সাথে সাথে প্রতিরোধ আন্দোলন ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে যেতে লাগল। যেহেতু মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে শুধু রাইফেল ও কয়েকটি র্র্র্২র্ ইন্সি র্৪র্ ইন্সি মটার । তাই আধুনিক পাকবাহিনীর সাথে পাল্লা দেওয়ার মুক্তিযোদ্ধাদের কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিদিন মুক্তি সেনারা পিছিয়ে আসায় বিকল্প প্রশিক্ষণ ক্যাম্প খোলার কথা চিন্তা করতে হলো রামগড় নেতৃবৃন্দ ও সামরিক অফিসারদের শুরু হলো হরিণা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের কাজ।

About admin

Leave a Reply