ব্রেকিং নিউজ
Home » অন্যান্য » দোস্ত মোহাম্মদ চৌধুরীর লেখনীতে মুক্তিযুদ্ধ

দোস্ত মোহাম্মদ চৌধুরীর লেখনীতে মুক্তিযুদ্ধ

::নুরুল আলম:: সংখ্যা ৩
ভাষা সংগ্রাম থেকেই আমাদের স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সুত্রপাত। চুড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকন্ঠে ঘোষনা করে ছিলেন, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। শুরু হয়ে গেল বাংলার সর্বত্র স্বাধীনতার প্রস্তুতি।
চট্টগ্রাম কালুর ঘাটে প্রতিরোধ ব্যর্থ হওয়ায় রাঙামাটি, মহালছড়ি, হয়ে মেজর মীর শওকত(বর্তমান বি এম পির কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক মন্ত্রী) ক্যাপ্টেন মাহফুজ, ক্যাপ্টেন মারী, ক্যাপ্টেন কাদের এবং কয়েকজন সুবেদার ও বেশ কিছু সৈন্য নিয়ে ২৪ এপ্রিল মাহলছড়িতে ঘাটিঁ স্থাপন করে খাগড়াছড়িতে এসে পৌছান।
অপরেিদক পাক বাহিনী রাঙামাটি শহর দখল করার পর ২০ এপ্রিল বুড়িঘাট নানিয়ার চর হয়ে মূল প্রতিরক্ষা কেন্দ্র মহালছড়ির দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ১৯৭১ এর ২০ এপ্রিল মাসে ৮ম ইষ্ট বেঙ্গল এর সাথে তৎকালীন ইষ্ট পাকিস্থান রাইফেস এর কিছু সৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রাম হানাদার বাহিনীর বিরুদেধ যুদ্ধরত ছিল। শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ ছিলেন কোম্পানীর মেশিন গানার। ৭১ এর ২০ এপ্রিল তারিখে শত্রু পক্ষের ২য় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের পক্ষে ১টি কোম্পানি ৬ ইন্সি মটার নিয়ে ৩ টি লঞ্চ ও ২ স্প্রীড বোঝাই করে করে প্রতিরক্ষা এলাকায় ঢুকে পড়ে।
মুক্তি বাহিনীকে দেখা মাত্রই শত্রু সৈন্যরা ৬ ইন্সি মটার ও অন্যান্য অস্ত্র নিয়ে গোলা বর্ষণ শুরু করলে বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। একমাত্র ল্যান্স নায়েক মুন্সী আবদুর রউফ তার নিজের অবস্থানে থেকে নিজের মেশিন গান দিয়ে শত্রু পক্ষের উপর গোলা বষর্ণ অব্যাহত রাখেন। যার ফলে শত্রুর ২টি লক্ষও ১টি স্প্রীড বোর্ড পানিতে ডুবে যায় এবং ২ প্লাটন শত্রু সৈন্য ধ্বংশ হয়। অক্ষত নৌযান গুলোতে অবশিষ্ট শত্রু নৈসরা পশ্চাদপস্বরণ করতে বাধ্য হয়। শত্রু প্রবল গোলা বর্ষণের মুখে ও ল্যান্স নায়েক আবদুর রউফ তার মেশিনগান নিয়ে নিজের অবস্থানে স্থির ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ বিপক্ষে মর্টারের গোলা তার কার্ধে আঘাত করলে তিনি মাটিতে লুটে পড়েন। তিনি শাহাদাৎ বরণ করেন। শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আবদুর রউফ এর অসীম বীরত্বর্র্পূণ আত্মত্যাগের ফলে শত্র বাহিনী সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ঘাটি মাহলছড়িতে আর আঘাত হানতে পারেনি। স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর শ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আবদুর রউফ ১৯৪৩ সালে মে মাসে ফরিদপুর জেলা বোয়লমারি থানার সালামপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতার নাম মুন্সী মেহেদী হোসেন। ১৯৬৩ সালের ৮ই মে তিনি তৎকালীন ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেল্্স বাহিনীতে সৈনিক হিসাবে যোগদান করেন।
২৫ এপ্রিল মেজর মীর শওকত খাগড়াছড়িতে একরাত কাটিয়ে পরের দিন ২৬ এপ্রিল মেজর জিয়াসহ সৈনদের সংগঠিত করে মেজর মীর শওকত মহালছড়ি চলে যান মেজর জিয়া রামগড়ের দিকে চলে যান, প্রতিরোধ ব্যুহ রচনা করতে ২৭ এপ্রিল পাকবাহিনী রাঙামাটি থেকে মহালছড়ি অভিমুখে জলপথে অগ্রসর হয়। ঐদিন সম্মূখ যুদ্ধে ক্যাপ্টেন কাদের আসিম বিরত্বে সহিত যুদ্ধ করেন। এক সময় বর্তমান মহালছড়ি থানা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে কবর স্থানে ডান পার্শ্বে বট বৃক্ষের নিচে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর আহত অবস্থায় মেজর মীর শওকতের নির্দেশে তাকে রামগড় পাঠানো হয়। রামগড় নেওয়ার পথে তিনি জালিয়াপাড়া নামক স্থানে শাহাদাৎ বরণ করেন। সর্ম্পূণ সামরিক মর্যাদায় তাকে রামগড়ে দাফন করা হয়। শহীদ ক্যাপ্টেন কাদেরকে কবর দেয়ার সময় দেখা গেল তার হাতে বিয়ের মেহেদী রং জ্বল জ্বল করছে। তিনি সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকে রেখে যান।
২৭ এপ্রিল মহালছড়ি পতনের পর পাকবাহিনী ঐদিন খাগড়াছড়ি দখল করে এর পূর্বে ২৬ এপ্রিল আমি ও নুর বক্স মিয়া লঙ্গর খানার আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে ডি,সি সাহেবের সাথে পরামর্শের জন্য রামগড়ে যাই। ২৯ এপ্রিল ফেরার পথে জালিয়াপাড়ায় মেজর মীর শওকতের সংঙ্গে সাক্ষাত হলে তিনি আমাকে ও নূর বক্স মিঞাকে খাগড়াছড়ি প্রত্যাবর্তনে নিষেধ করেন। তাই আমরা পুনরায় রামগড়ে ফিরে যাই। পাক হানাদার বাহিনীরা ধরে নিয়েছে রামগড় সীমান্ত বর্তী থানা, কাজেই তার পতন ঘটিয়ে তাদের দখরে নেওয়া প্রয়োজন। সুতরাং রামগড়কে উদ্দেম্য করে তিন দিক থেকে আক্রমন শুরু করে মহালছড়িতে কাদের শহীদ হওয়ার পর আমাদের বাহিনী টিকতে না পেরে ২৯ তারিখে জালিয়াপাড়া ৩০ এপ্রিল রামগড় পিছু হঠতে বাধ্য হয়।
অপর দিকে দেখাগেল পাক হানাদারদের একটি বড় দল করের হাটে হেঁয়াকো রামগড়েরর দিকে অগ্রসর হইতেছে মেজর সামছু উদ্দিন সুবেদার ফারুক উদ্দিন প্রমূখের মরণ পন চেষ্টাতেও ডিফেল রক্ষা করতে না পারায় রামগড়ে দিকে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। অপর দল ক্যাপ্টেন অলির নেতৃত্বে চ্ট্টগ্রাম দিক থেকে আগত দল হিঙ্গুলী করের হাট ও তুলাতলি অবস্থান ছেড়ে হেয়াঁকোতে অবস্থান নিল। লেঃ হিজাজোত হেয়াকোতে ডিফেন্স নিলেন। সমরিক দিক দিয়ে হেঁয়াকো ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী পরবর্তী ধাপে মুক্তিযুদ্ধাদের সদর দপ্তর রামগড় আক্রমন করতে চেয়েছিল। ২৭ এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনী ভাড়ি অস্ত্রসস্ত্রের সাহায্যে তিন দিক থেকে মুক্তিযোদ্ধার উপর আক্রমন চালায় মুুক্তিযোদ্ধারা হেঁয়াকো এলাকায় টিকে থাকতে ব্যর্থ হলো। ২৮ এপ্রিল আবার পাকহানাদার বাহিনী চিকনছড়া ছেড়ে বাগানবাড়ী নামক স্থানে অবস্থান নেয়। ১ মে চিকনছড়া ও নারায়ন হাট থেকে পাক বাহিনীর আক্রমনের ফলে বাগান বাড়ী ছেড়ে মুক্তিযোদ্ধারা রামগড়ের দিকে পিছু হাট বাধ্য হয়।
৩০ এপ্রিল তা সর্ব্বাধীনায়ক কর্ণেল মরহুম এম এ জি ওসমানী রামগড়ে আসেন কর্ণেল ওসমানী দুই দিন রামগড়কে নিজেদের নিয়ন্ত্রনে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে বললেন। মেজর জিয়া ও মেজর শওকত , ক্যাপ্টেন রফিক, ক্যাপ্টেন অলি, ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান , ক্যাপ্টেন ভূঞা লেঃ মাহফুজ প্রমূখ অফিসার রামগড়কে নিজেদের নিয়ন্ত্রনে রাখার সর্বত্বাক চেষ্টা করতে লাগলেন। ১ মে থেকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী একটি ব্রিগেড তিন দিক থেকে রামগড়কে আক্রমন করে। ২ মে এর সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষণ চলে। মুক্তিযোদ্ধারা অবশেষে ঐ তারিখ রাতেই ভারতের সাবরুমে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলো। সমস্ত চট্টগ্রাম এলাকা পাকবাহিনীর নিয়ন্ত্রনে চলে গেল। পতন ঘটল রামগড়, খাগড়াছড়ি তথা চট্টগ্রামের।

About admin

Leave a Reply