পাহাড়ে চুক্তির ২২ বছরেও অধরা শান্তি নামের সোনার হরিণ


নুরুল আলম/আল-মামুন:: প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য,সম্পদে সমৃদ্ধ সম্ভবনাময় পার্বত্য চট্টগ্রাম। সে পাহাড় ছিল এক সময় ভয় আর আতঙ্কের। পাহাড়ি আর বাঙ্গালীদের মধ্যে ছিল নানা মত প্রার্থক্য আর বিবেদ। সব কিছুই মুলে ছিল স্বার্থ। কারণ একটায় একমাত্র মাথা গোজার ঠাঁই ভূমি,বসবাস আর অর্থের প্রয়োজনে উপার্জন মেটাতে সকল সম্প্রদায় তাদের নিজ নিজ অবস্থানকে পাকাপোক্ত রাখতে মনের মধ্যে লালন করেছিল আন্দোলন,সংগ্রাম আর অধিকার আদায়ের রশি নিয়ে টানা টানিতে। আর সে দীর্ঘ পথে ছিল সংঘাতেরও।

এক সময় পাহাড়ে হানাহানি,সংঘাত আর খুনির রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে পার্বত্য চুক্তি সম্পাদন করে তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকার। ফলে অশান্ত আর শান্তির পথে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম’ সংঘাতের পথ পরিহার আর শান্তির পথে ফেরার সমতায় চুক্তি স্বাক্ষর করলেও সেই কাঙ্খিল শান্তি এখনো পুরো বাস্তবায়ন হয়নি পাহাড়ে।

পূর্বে সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও ভিন্ন মতের ফলে সময়ের পালা বদলে তা বর্তমানে ৪টি সংগঠনে রূপ নেয়। ফলে নিজেদের মধ্যে মত ভেদ আর মতঐক্যের বিভাজনের অসন্তুষ্টিতে একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাড়িয়েছে সংগঠনগুলো। তবে বর্তমানে ৪ সংগঠনের দাবী পার্বত্য শান্তি চুক্তির যথাযথ ও পূর্ণবাস্তবায়ন। ১৯৭৬ সাল থেকে শুরু সেই রক্তাক্ত পথ থেকে শান্তির পথে ফেরাতে বাংলাদেশের সব সরকারই সাধ্যমত চেষ্টা করেছে। অবশেষে ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে রক্তাক্ত অধ্যায়ের সফল অবসান ঘটিয়ে সূচিত হয় নতুন অধ্যায়ের।

শান্তি চুক্তি ও বাস্তবায়ন: ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে তৎকালীন চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আব্দুল্লার সঙ্গে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেন পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি শীর্ষ নেতৃবৃন্দের পক্ষে সন্তু লারমা। এখানে উল্লেখ্য যে, কোন প্রকার তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই এবং কোন বিদেশি শক্তিকে যুক্ত না করেই এ শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন হয়েছিল যা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল।

এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে তৎকালীন স্বশস্ত্র গ্রুপ শান্তি বাহিনীর দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের সংগ্রামের। শান্তি চুক্তির শর্তানুযায়ী বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে ভারত থেকে প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থীদেরকে পুনর্বাসন করে। শান্তি বাহিনীর সংঘাতের কারণে বাঙ্গালীদের গুচ্ছগ্রামে আনা হলেও স্ব-স্ব ভূমিতে পূর্নবাসন করা হয়নি। চুক্তির অধিকাংশ ধারা সম্পুরণরূপে এবং বাকী ধারাগুলির অল্পকিছু আংশিক বাস্তবায়ন সহ কিছু ধারার বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানান দেওয়া হচ্ছে।

চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের বিভিন্ন বিভাগসহ তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এসব বিভাগে লোকবল নিয়োগে চুক্তির শর্তানুযায়ী ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সদস্যদের প্রাধান্য দেওয়ায় স্থানীয়ভাবে তাদের বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত প্রায় আড়াইশ অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প গুটিয়ে ফেলা হয়েছে।

ভূমি ব্যবস্থাপনা: শান্তি চুক্তির সবচেয়ে জটিল বিষয়টি হচ্ছে ভূমি ব্যবস্থাপনা। এর জটিলতার প্রধান কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ না হওয়া। একাধিকবার পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপের উদ্যোগ নিলেও নানা কারণে তা আর হয়ে উঠেনী। ফলে এখনো অবাস্থবায়িতই রয়ে গেছে ভূমি সমস্যা। তবে সরকার চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষে নানা মূখী উদ্যোগ গ্রহণ করে তা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। ভূমি কমিশন গঠন করে কমিশন কাজও করছে। বিষয়টির ব্যাপকতা ও জটিলতার কারণেই জটিল হয়ে উঠেছে পাহাড়ের স্থায়ী শান্তি প্রত্রিয়া।

শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী পাহাড়ি সংগঠন জেএসএসের একটি অংশ ছাড়াও ইউপিডিএফ ও পরে ইউপিডিএফ গনতান্ত্রিক এর জন্ম হয়। ফলে পাহাড়ে আঞ্চলিক রাজনীতির মেরুতে নতুন আন্দোলনের মাত্রা যুক্ত হয়। এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্গে বাংলাদেশের দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের অভিন্ন সিমান্তের প্রায় ২৬২ কিমি অরক্ষিত থাকায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে ভূল বোঝাবুঝি এবং ঝুঁকির সৃষ্টি হয়সহ রয়েছে নানামূখী অভিযোগও।

পাহাড়ে নানা ষড়যন্ত্র আর বিদেশী চক্রের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো প্রকার শিল্পায়নের প্রসার ঘটাতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সারা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের একটি প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ৪ সংগঠনের মধ্যের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও সংঘাত ও খুনোখুনিতে অনেক মায়ের কোন খালি হলে তার দায়ভার কার?

শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে, ক্ষুদ্র ও বৃহৎ জাতিসত্তার সম্মিলিত ইচ্ছা ও চেষ্টার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্প্রীতি বিনষ্ট থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিরাপদ রাখাসহ ভূমি সমস্যার সমাধান কল্পে জরুরী ভিত্তিতে ভূমি জরিপ,চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতার পাশাপাশি পাহাড়ি-বাঙ্গালী সকলে মিলে পাহাড়কে শান্তির নিবাসে পরিণত করার বিকল্প নেই বলে মনে করেন সচেতন মহল।

পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি প্রক্রিয়ার আরেক অংশিদার বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বর্তমান নিরাপত্তার আলোকে ২২ বছর পূর্বে স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তিকে পরিপূর্ণভাবে ভূূমিকা পালন করে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী তথা নিরাপত্তা বাহিনী নিজ দেশের শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। তাই পার্বত্য এলাকার শান্তি পরিবেশ আরও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় শান্তির পথ সুদৃঢ় হবে মনে করে অভিজ্ঞ মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *